গাঢ় নীল জল, চারপাশে ট্রপিক্যাল সবুজ আর এক রহস্যময় পরিবেশ—ফিলিপাইনের হিনাতুয়ান নদী সত্যিই পৃথিবীর বুকে এক অনন্য বিস্ময়। সাধারণত নদীর পানি হয় মিঠা, কিন্তু ফিলিপাইনের এই নদীর পানি লবণাক্ত এবং এটি গিয়ে মিশেছে প্রশান্ত মহাসাগরে।
দৈর্ঘ্যে খুব বড় না হলেও স্থানীয় লোককথা আর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের জন্য এটি আজ কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। অসংখ্য পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ এখানে ভিড় করেন শুধু এর অপার্থিব সৌন্দর্য দেখার জন্য।
দীর্ঘদিন ধরে অনেকে বিশ্বাস করে আসছেন, এই নদীর লবণাক্ত পানির উৎস অলৌকিক—আর সেই রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, নদীটির উৎস কোনো ভূগর্ভস্থ গুহা ব্যবস্থা থেকে, যা এখনো সম্পূর্ণভাবে মানচিত্রে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
হিনাতুয়ান এনচ্যান্টেড নদী প্রথম দেখায় অবাস্তব মনে হয়। কারণ এখানে পানির রং একঘেয়ে নয়।
সকালের আলোয় ও দিনের বেলায় দেখা যায় নীলকান্তমণির মতো স্যাফায়ার, হালকা আকাশি সেরুলিয়ান আর সবুজাভ জেডের মিশ্রণ। যেন রূপকথার বই থেকে উঠে আসা কোনো দৃশ্য।
মিন্দানাও অঞ্চলে এই নদী ঘিরে বহু লোককথা প্রচলিত। সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পগুলোর একটিতে বলা হয়, স্থানীয় ভাষায় ‘দিওয়াতা’ নামে পরিচিত পরীরা তাদের জাদুদণ্ড দিয়ে এই পানিতে জাদুকরী রং এনে দিয়েছে।
আরেকটি কাহিনি বলছে, ‘এনকান্টো’ নামে রহস্যময় অতিপ্রাকৃত রক্ষকরা এই নদী ও এর ভেতরের প্রাণীদের পাহারা দেয়। নদীর জন্মলগ্ন থেকেই তারা নাকি এর সুরক্ষা করে আসছে।
দৈর্ঘ্যে ছোট হলেও হিনাতুয়ান এনচ্যান্টেড নদীর গভীরতা নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। একসময় একে ‘অতল’ বলেই ধরা হতো। ২০১৫ সালে ডুবুরি বার্নিল গাস্টার্ডোর নেতৃত্বে একদল গবেষক প্রায় ৮২ মিটার (২৬৯ ফুট) গভীর পর্যন্ত অনুসন্ধান চালান।
তবু নদীর প্রকৃত তল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নদীর এক অংশ অগভীর ও নিরাপদ, যেখানে পর্যটকরা সাঁতার কাটতে পারেন। কিন্তু হঠাৎ করেই পানি গাঢ় নীল হয়ে গভীর খাদে নেমে যায়। এই ভূগর্ভস্থ গুহা ব্যবস্থা নদীটিকে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, ফলে সঠিক গভীরতা মাপা কঠিন—আর সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে অসংখ্য কৌতূহল।
মাছ ধরা যায় না যে কারণে
এই নদীতে মাছ ধরা প্রায় অসম্ভব—এমনটাই বিশ্বাস স্থানীয়দের। লোককথা বলছে, যে আত্মারা নদীকে রক্ষা করে, তারাই মাছদেরও সুরক্ষা দেয়। মাছগুলো নাকি গভীর গুহায় লুকিয়ে থাকে এবং জেলেরা কাছে গেলেই মিলিয়ে যায়।
প্রতিদিন দুপুর ১২টা ও বিকেল ৩টায় নদীর দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা মাছদের খাবার দেন। তাদের খাবারের তালিকায় থাকে ভাত, কিমা মাংস, অক্টোপাস, চিংড়ি ও নানা খাবারের টুকরা। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে এই খাওয়ানো, আর পর্যটকেরা তীর থেকে সেই দৃশ্য উপভোগ করেন। এই সময় একটি ঘণ্টা বাজানো হয় এবং ‘হিম্ন অব হিনাতুয়ান’ বাজে—যা দর্শনার্থীদের সাঁতার এলাকা খালি করার সংকেত। ২০১৭ সাল থেকে মাছ খাওয়ানোর মূল অংশে সাঁতার কাটা নিষিদ্ধ। এখন নির্দিষ্ট এলাকাতেই শুধু ডুব দেওয়া যায়।
এটিও মনে রাখা জরুরি, এই এলাকা একটি সংরক্ষিত প্রাকৃতিক অঞ্চল। তাই নদীর আশপাশে খাবার বা ওষুধের দোকান নেই।
কিভাবে যাবেন
ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপে হিনাতুয়ান শহরের বাইরে অবস্থিত এই এনচ্যান্টেড নদী। বুটুয়ান সিটির ডোমেস্টিক বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে করে হিনাতুয়ানে পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে খানিকটা উঁচুনিচু রাস্তা পেরোলেই এই বিস্ময়কর নদীর দেখা মিলবে।
এটি আর গোপন কোনো জায়গা নয়। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে ও সপ্তাহান্তে এখানে প্রচুর পর্যটকের ভিড় থাকে। বিকেল ৫টার পর পর্যটকদের জন্য এলাকা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
স্বচ্ছ নীল জলে সাঁতার কাটা ছাড়াও আশপাশে নৌকাভ্রমণ উপভোগ করা যায়। আর মাছ খাওয়ানোর দৃশ্য দেখলে অবাক না হয়ে উপায় নেই। ডাক পড়তেই ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ চলে আসে, আবার পেট ভরে গেলেই অদৃশ্যের মতো মিলিয়ে যায় গভীর নীল জলের ভেতর।
সূত্র : এনডিটিভি












